Showing posts with label সম্পাদকের কলম. Show all posts
Showing posts with label সম্পাদকের কলম. Show all posts

Sunday, 16 March 2025

রমজানের মাহাত্ম্য নষ্ট করে ইফতারি নামক কুপ্রথা

রমজানের মাহাত্ম্য নষ্ট করে ইফতারি নামক কুপ্রথা



শুরুটা করছি একটি ঘটনা দিয়ে-

রমজান মাসের ঠিক চার মাস পূর্বে দাম্পত্য জীবন শুরু করেন শামীম আহমদ ও হেলেনা বেগম। বিয়ের পর প্রথম রমজান মাসে ইফতারি আসবে সেই আশায় থাকেন বরের পিত্রালয়ের লোকজন। সিলেটের ঐতিহ্য হিসেবে যথারীতি হেলেনার বাবার বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়িতে ইফতার পাঠানোও হয়। কিন্তু সেই ইফতার সামগ্রী শ্বশুরবাড়ির লোকজনের মনমতো হয়নি। আর সেটা নিয়ে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের নানান কথা শুনতে হয় হেলেনাকে। এরই জেরে নিজ ঘরে ফ্যানের সঙ্গে রশি পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন হেলেনা। ঘটনাটি সিলেটের জৈন্তাপুরের। 

পুরো দেশেব্যাপী এরকম ৮/১০টি ঘটনা প্রতি রমাজনেই ঘটে থাকে। এরকম আত্মহত্যার ঘটনা এমনকি ডিভোর্স, অত্যাচার-নির্যাতনে কত বিবাহিতার সংসার তছনছ হয়ে যায় তার ইয়ত্তা নেই।  ইফতারি, আম-কাঠালী, বরের আত্মীয়স্বজনদের কাপড়চোপড় উপহার সামগ্রী-সহ হরেক রকমের কুপ্রথা যেন আমাদের সভ্য সমাজের মানুষজন অসভ্যভাবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন। এসব রেওয়াজ কতশত পরিবারের হাহাকার বয়ে আনে তা আমরা ক'জনই জানি? সামাজিক রীতির নামে সিজনালভাবে আমরা আত্মহত্যা, ডিভোর্স আর পারিবারিক কলহের জন্ম দিচ্ছি সেদিকে আমাদের কারো ভ্রুক্ষেপই নেই!

অথচ, রমজান মাস সিয়াম সাধনার মাস। নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত, দান-সদকা ইত্যাদি ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহতায়ালার নৈকট্যলাভের সুযোগ মেলে এ মাসে। কিন্তু পবিত্র এই মাসে ইফতারি নামক নিন্দিত কাজ ক্ষুণ্ণ করছে রমজানের মাহাত্ম্য। ইফতারি প্রথা দরিদ্রদের জন্যে এক মহাআতঙ্কের নাম ও ধনবানদের জন্যে এক বিলাসী প্রথা।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় এই প্রথার প্রচলন রয়েছে। আর এটা এমনভাবে মহামারী আকারে ছড়িয়ে গেছে যে, শ্বশুরবাড়ি থেকে ইফতারি আসতেই হবে। অনেক সময় দরিদ্র বাবা মেয়ের সুখের জন্যে নিজের কষ্ট লুকিয়ে রেখে হাসিমুখে মেয়ের শ্বশুরবাড়ি ইফতার পাঠায়। অন্যদিকে ইফতার প্রেরণেই যে মেয়ের নিষ্কৃতি মিলবে- এমন নয়। বাড়ির অন্য বউদের শ্বশুরবাড়ি থেকে পাঠানো ইফতারের সঙ্গে তুলনাও করা হয়। যার শ্বশুরবাড়ি থেকে যত বেশি ইফতার আসে তার ততো সুনাম। তেমনি যে মেয়ের বাবার সে সক্ষমতা কম তিনি ইফতার দিয়ে খুশি করতে না পারলে অনেক ক্ষেত্রে কথা শুনতে হয় মেয়েকে।
হয়তো মেয়েটি জানে তার বাবার অবস্থা তবুও শ্বশুরবাড়িতে নিজের সম্মানজনক অবস্থান ধরে রাখতে অনেক সময় ভেতরে চাপা কষ্ট নিয়েই বাবাকে অনুরোধ করে। মেয়ের আবদার ফেলতে পারেন না বাবা। যেভাবেই হোক টাকা সংগ্রহ করেন। সামাজিকতার এই নিয়মের চাহিদা মেটাতে কেউ সুদে টাকা নেন, কেউ গরু বিক্রি করেন কেউবা নিজের চিকিৎসার টাকা দিয়ে ইফতার সামগ্রী কিনে মেয়ের বাড়িতে পাঠান।

পক্ষান্তরে বিত্তশালী পরিবারগুলোতে চলে ইফতার প্রেরণের প্রতিযোগিতা। কে কতো বেশি ইফতার পাঠালো, কতো খরচ করলো- এ জাতীয় হিসাব-নিকাশে চলে যায় রমজান মাস।

তবে এই প্রথার বিরুদ্ধে সোচ্চার বর্তমান প্রজন্ম। অনেকেই এ কুপ্রথা ভেঙ্গে দিতে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। আমি নিজেও এই প্রথার ঘোর বিরোধী। আমার বিয়ের পর এবারের রমজানই প্রথম রমজান মাস। সে উপলক্ষে আমার শ্বশুর বাড়ি থেকে ইফতারি আসবে এমন প্রস্তাবনা শুনার সাথে সাথেই আমি তা শক্তভাবে বারণ করি। সবাইকে বুঝিয়ে বলি এসব কুপ্রথা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসা উচিৎ। কিন্তু শশুড়বাড়ির লোকজন সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রত্যাহার করতে মোটেও রাজি নন। কিন্তু আমার অনড় অবস্থান এবং বিস্তর আলোচনার পর উনারাও নিজেদের সিদ্ধান্ত বদল করেন। 

উপরোক্ত আলোচনা থেকে একটি বিষয় বেশ পরিষ্কার, আর তা হচ্ছে সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে এসব কুপ্রথা আমাদের সমাজে বেশ শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে পড়েছে। আমার শ্বশুরালয়ের সকলেই সমাজ সচেতন মানুষ। অথচ এই কুপ্রথাকে উনারাও সহজে বর্জন করার পক্ষে নয়। তার একমাত্র কারণ আমাদের সমাজের দৃষ্টিকোণ। আমার ঘরে ইফতারি না আসলে হয়তো উনাদের মেয়ের সম্মান কমে যাবে, অথবা আশেপাশের অনেকের ইফতারি আসবে আমার ঘরে না আসলে তা বেমানান দেখাবে এমন চিন্তা প্রত্যেক শ্বশুরালয়ের মানুষজনের মনে বিচরণ করে। বাস্তবে ঘটেও তা। সুতরাং ইফতারি প্রথা বর্জন করতে হলে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। 

আমি এব্যাপারে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। কে কি মনে করলো তাতে আমার ভ্রুক্ষেপ নেই। ইফতারি না আসলে যে গৃহকর্ত্রীর সম্মান কমে যাবে কিংবা তা মানদণ্ডে বিচার করা হবে তার পক্ষে আমি মোটেও নই। প্রসঙ্গত বলতে হয় যে, শ্বশুরালয় থেকে চাইলেই ৫০০ মানুষের ইফতারি আসবে এমন সামর্থ্যও উনাদের রয়েছে, মাশাআল্লাহ। কিন্তু চাইলেই ইফতারি পাওয়া যাবে তবে সমাজ থেকে ব্যাধি দূর করা চাইলেই সম্ভব নয়। তাই আমরা যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে এসব ব্যাপারে এখনই সোচ্চার না হই তবে তা দূর করতে আরোও এক মহাকাল পথ পাড়ি দিতে হবে।

সমাজে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই এসব কুপ্রথা সামাজিক ব্যাধি হিসেবে প্রতিষ্ঠালাভ করে ফেলেছে। তাই আসুন সবাই এসব কুদৃষ্টিভঙ্গি ও ইফতারি, আমকাঠালী-সহ সকল কুপ্রথার ব্যাপারে সোচ্চার হই। মনে রাখবেন, এসব কুপ্রথাকে যারা উৎসাহিত করেন তারা সকলেই আত্মহননকারী, বিবাহ বিচ্ছেদ ও নির্যাতনের শিকার গৃহবধূর জন্য সমান অপরাধী। তাই এসব কুপ্রথাকে উৎসাহিকরণ নয়, দৃঢ়তার সহিত বর্জন করুন। কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় বলতে হয়-

আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে?
তোমার ছেলে উঠলে গো মা রাত পোহাবে তবে!'

বর্তমান প্রজন্মের সকলেই সচেতন, তাই এ প্রজন্ম জেগে উঠলেই রাত পোহাবে তাতে কোনো সন্দেহ নাই।

সালমান কাদের দিপু
সম্পাদক ও প্রকাশক
কুশিয়ারা নিউজ।

Tuesday, 28 May 2019

সিগারেটের অপর নাম জীবন!

সিগারেটের অপর নাম জীবন!


সম্পাদকের কলম:

বিশুদ্ধ পানির অপর নাম জীবন, যা আমরা সবাই জানি। কিন্তু, আপনি জানেন কী, সিগারেটের অপর নামও জীবন! এটা শুনে আপনি আশ্চর্য হচ্ছেন নিশ্চয়। কেননা এতোদিন পর্যন্ত শুনে আসছেন ‘সিগারেট স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর’ কিংবা ধূমপানে বিষপান অথবা এটি হৃদরোগের কারণ’। সেই ক্ষতিকর বস্তুর অপর নামই যদি ‘জীবন’ হয় তবে তো আশ্চর্য হওয়ারই কথা। তবে আমি সত্যিই বলছি সিগারেটের আরেক নাম জীবন। তাহলে চলুন কিভাবে সিগারেটের অপর নাম জীবন হয় তা জেনে নিই।

প্রথমে সিগারেটের ক্ষতিকর দিকটা জেনে নেয়া যাক।

সিগারেটের ক্ষতিকর দিকঃ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বিভিন্ন বৈজ্ঞানিকগণসহ মোটামুটি সর্বজনীনভাবে এটি স্বীকৃত যে, ধূমপান যক্ষ্মা, ফুসফুসের ক্যান্সার-সহ নানা রোগের অন্যতম প্রধান কারণ এবং ধারক ও বাহক।

সিগারেটে আসক্ত একজন ব্যক্তি একাধিক জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা থাকে। যার মধ্যে মরণব্যাধি ক্যান্সার অন্যতম।

সিগারেটের ধোঁয়ায় ক্যান্সার সৃষ্টিকারী মিউটাজেন থাকে। এই মিউটাজেন মানুষের মুখ, শ্বাসনালি, গ্রাসনালি এবং ফুসফুসে ক্যান্সার সৃষ্টি করে। বর্তমানে মোট ক্যান্সারে আক্রান্তদের মধ্যে অধিকাংশ রোগির রোগ সৃষ্টির মূলে রয়েছে সিগারেট আসক্তি। সিগারেটে থাকা নিকোটিন নামক বিষাক্ত পদার্থ ধোঁয়ার সাথে মানুষের দেহে প্রবেশ করে। সিগারেটের ধোঁয়া বের হয়ে আসলেও ধোঁয়ায় থাকা নিকোটিন মানব দেহে জমতে থাকে। একপর্যায় তা মানুষের রক্তের সাথে মিশে রক্তকে দূষিত করে ফেলে। এর প্রভাবে দেহে রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙ্গে পড়ায় নানা কঠিন রোগ দেখা দেয়।

সিগারেটে আসক্ত ব্যক্তি ব্রংকাইটিস নামের আরোও একটি জটিল রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাসনালিতে প্রদাহ এবং কাশির সৃষ্টি হয়। এতে শ্বাসনালি ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে পড়ে। যার ফলে হাঁপানি শ্বাসকষ্টের মতো জটিল রোগের সৃষ্টি হয়। এ রোগের প্রভাবে ব্যক্তির ফুসফুস অনেকাংশে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।

এছাড়া ধূমপানের ফলে শ্বাসনালিগুলোর বায়ুপথসমূহ সরু এবং ফুসফুসে অতি স্ফীতি দেখা দেয়। একে এমফাইসিমা বলে। এর ফলে ফুসফুসে জটিল পরিবর্তন লক্ষ্যিত হয়।

সিগারেটে আসক্তির ফলে উদ্গারি কাশিও দেখা দিতে পারে। এ জন্য অনেকের প্রচন্ড কাশি এবং কাশির সাথে ফুসফুস থেকে মিউকাস বেরিয়ে আসতে দেখা যায়।

তাছাড়া, সিগারেটে নিকোটিনসহ ৫৬টি বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে বলে গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে। যা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বলে সর্বদা প্রমাণিত হয়ে আসছে।

উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, ২০১০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে বিশ্বের ১৯২টি দেশে পরিচালিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয়, নিজে ধূমপান না করলেও অন্যের ধূমপানের (পরোক্ষ ধূমপান) প্রভাবে বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর প্রায় ৬,০০,০০০ মানুষ মারা যায়। এর মধ্যে ১,৬৫,০০০-ই হলো শিশু। শিশুরা পরোক্ষ ধূমপানের কারণে নিউমোনিয়া ও অ্যাজমায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর দিকে ঝুঁকে পড়ে। এছাড়া পরোক্ষ ধূমপানের কারণে হৃদরোগ, ফুসফুসের ক্যান্সার-সহ শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত রোগও দেখা দেয়। এ গবেষণা থেকে আরোও জানা যায়, পরোক্ষ ধূমপানে পুরুষের তুলনায় নারীর উপর বেশি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। পরোক্ষ ধূমপানের কারণে বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৮১,০০০ নারী মৃত্যুবরণ করেন।

উপরোল্লিখিত বিশ্বস্ত তথ্যসূত্র থেকে এটা প্রমাণিত যে সিগারেট স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এটি শুধু আসক্ত ব্যক্তিরই নয় বরং পরিবেশ তথা পরিবার, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী-সহ একটি দেশের পুরো জনগণের সুস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ

এ হুমকি অকাল কান্না বয়ে আনে। ভারী করে তুলে একটি দেশের রোগবালাইয়ের সংখ্যা।

শুধু কী তাই? এটি কতশত পরিবারের দুর্ভোগ বয়ে আনে তার কোনো ইয়ত্তা নেই।

এতক্ষণে আপনি নিশ্চয় বুঝে গেছেন সিগারেট আপনার জীবনকে কিভাবে ধ্বংসের মুখে ফেলে দেয়। এবার সিগারেটকে আপনার জীবন কল্পনা করুন। ভাবুন প্রতিটি টানে সিগারেট যেমন ক্ষয় হয় ঠিক তেমনি এটি আপনার জীবনকেও ধীরেধীরে ক্ষয় করতে থাকে। কল্পনা করুন সিগারেটের অগ্রভাগে আপনি আগুন ধরালেন মানে আপনার নিজের সুন্দর জীবনে আপনি আগুন ধরালেন। কল্পনায় দেখুন, আগুন ধরানোর ফলে সিগারেট ধীরেধীরে ক্ষয় হচ্ছে, এর সাথে ক্ষয় হচ্ছে আপনার সুন্দর জীবন।

কি দেখতে পাচ্ছেন? পুড়তে পুড়তে একসময় সিগারেট নিঃশেষ হয়ে যায়, ঠিক তেমনি আপনার জীবন বাতিটিও একসময় নিভে যায়। আর হ্যা এটাই করুণ বাস্তবতা!

তাই আমি যথার্থই বলে থাকি ‘সিগারেটের অপর নাম জীবন’। কারণ আপনি সিগারেট পোড়াচ্ছেন মানে আপনার জীবন পোড়াচ্ছেন। অতএব, সিগারেটকে সবসময় আপনার জীবন কল্পনা করুন। আর জীবনকে পোড়াতে না চাইলে সিগারেটে আগুন ধরানো থেকে বিরত থাকুন।

…..সালমান কাদের দিপু,
সম্পাদক, কুশিয়ারা নিউজ ডটকম